Select Page

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে কারখানার ভেতরেও জীবাণুনাশক ছিটানো হয়। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

তাদের আশা, আগামী ডিসেম্বরে বড় দিন ঘিরে প্রাণ ফিরতে শুরু করবে বিশ্বের পোশাক বাজারে, আর তখনই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ, এবং করোনাভাইরাস মহামারীকে কেন্দ্র করে অনেক কোম্পানি চীন ছাড়ায় আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের অনেক ব্যবসায়ী।

পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের অনেকে এখনও মনে করছেন, আমেরিকার বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানিতে ভাগ বসানোর একটি ভালো সুযোগ তাদের সামনে আসতে পারে।

তারা বলছেন, মহামারী কোভিড-১৯ গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকেই তছনছ করে দিয়েছে। তার প্রভাব রপ্তানি বাণিজ্যেও পড়েছে।

মানুষের আয়-উপার্জন কমে যাওয়ায় পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ‘খুবই প্রয়োজন (বেসিক আইটেম)’ ছাড়া অন্য কোনো পোশাক কিনছে না কেউ। বড় বড় ফ্যাশন হাউজগুলো এখনও খোলেনি। অনলাইনে কিছু কেনাকাটা হচ্ছে।

এ অবস্থায় চলতি অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেও পোশাক রপ্তানিতে মন্দাভাব থাকবে। তবে ডিসেম্বরের বড়দিনকে ঘিরে রপ্তানি ফের ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদী তারা।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২০’ অনুযায়ী, পোশাক রপ্তানিতে একক দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন।

পরিমাণের বিচারে অনেক পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানটি এতদিন ছিল বাংলাদেশের। দেশের মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশের মতো আসে তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আর ভিয়েতনাম ৩ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বলে তথ্য দিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান দপ্তর।

পুরো অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের অর্থবছরের (২০১৮-১৯) চেয়ে ১৮ দশমিক ১২ শতাংশ কমেছে।

এর মধ্যে মহামারী শুরুর পর ২০২০ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বাংলাদেশ ৯৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম রপ্তানি করেছে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯১ ডলারের পোশাক।

আর এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ভিয়েতনাম।

পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এখন আমাদের মোট ক্যাপাসিটির ৬০-৭০ শতাংশ উৎপাদন করছি। অর্ডার আসছে, তবে কম। বেসিক আইটেমের (অতি প্রয়োজনীয়) পোশাক রপ্তানি হচ্ছে।

 

“বড় বড় ফ্যাশন হাউজগুলো এখনও খোলেনি। অনলাইনে কিছু বেচাকেনা হচ্ছে। বায়ারদের কাছ থেকে আমরা যতটুকু আভাস পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে ডিসেম্বরে বড় দিনকে ঘিরে বিশ্ববাজারে পোশাক কেনাবেচা বাড়বে। আমাদের রপ্তানিও ঘুরে দাঁড়াবে।”

 

পারভেজ বলেন, করোনাভাইরাস মহামারী কারণে সব দেশের রপ্তানিই কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চীন।

চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪৯ শতাংশ। বাংলাদেশের কমেছে ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে যে ভিয়েতনাম দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, তাদেরও এই ছয় মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

“ভিয়েতনাম আমাদের থেকে এগিয়েছে, এটা নিয়ে আমরা মোটেই চিন্তিত বা বিচলিত নই। রপ্তানিতে কে বড়, কে ছোট সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আসল কথা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি। গ্রোথ হচ্ছে কি না, টার্গেট (লক্ষ্যমাত্রা) পূরণ হচ্ছে কি না- সেটাই বড় কথা।”

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি পারভেজ বলেন, প্রতি বছর রপ্তানি বেড়েছে বলেই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছিল। মহামারীর ধাক্কায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমে ৩২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

“আমাদের এখন প্রধান কাজ হচ্ছে টিকে থাকা। এই মাহামারী ওভারকাম করে, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে থাকা। তাহলে আমরা কোভিড-১৯ মহামারীর কিছু সুফলও হয়ত পেতে পারি। এই সুযোগটিই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। সেজন্য সরকার-বেসরকারিভাবে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করে দিতে হবে।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পারভেজ বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে। করোনাভাইরাস মহামারীকে কেন্দ্র করে সেই দ্বন্দ্ব আরও বেড়েছে।

“এই অবস্থায় আমেরিকা যদি চীন থেকে পোশাক না কেনে অথবা কমিয়ে দেয়, তাহলে সেই বাজার বাংলাদেশের দখল করার একটা সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আর যদি সেটা হয়, তাহলে আমেরিকার বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানিতে ভাগ বসানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হবে বাংলাদেশের।”

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্স অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়ানোর পর থেকেই একটু একটু করে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমছিল। গত ডিসেম্বরে উহানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সেটি ব্যাপকভাবে কমে যায়।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২ হাজার ৪৮৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে চীন, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ কম। আর মহামারী শুরুর পর গত জানুয়ারিতে রপ্তানি কমে যায় ৩৬ শতাংশ।

চীন চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮৯ কোটি ডলার পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ শতাংশ কম।

অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ভিয়েতনাম ৪১৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই সময়ে তাদের রপ্তানি ১ দশমিক ৩১ শতাংশ কমলেও চীনের চেয়ে তা ২৯ কোটি ডলার বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষস্থানের মুকুটটি এখন ভিয়েতনামের।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনকে টপকে ভিয়েতনাম এক নম্বর স্থান দখল করলেও বাংলাদেশ আগের মতোই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। তবে সুখবর হচ্ছে, সেখানে চীন ও ভিয়েতনামের রপ্তানি কমলেও বাংলাদেশের কিছুটা বেড়েছে।